নিজস্ব প্রতিবেদক।।
সময়ের স্রোতে বদলে যায় মানুষের কর্মক্ষেত্র, ঠিকানা ও জীবনযাত্রা। ব্যস্ততার কারণে দূরত্ব তৈরি হলেও স্কুলজীবনের বন্ধুত্ব আর সোনালি দিনের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হলে মুহূর্তেই যেন ফিরে আসে কৈশোরের সেই দুরন্ত দিনগুলো।
তেমনই এক আবেগঘন ও আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় কুমিল্লা নগরীতে। নগরীর বাদুরতলাস্থিত হামসাফার রেস্টুরেন্টে এক চা আড্ডায় মিলিত হন এসএসসি ’৯৫ ব্যাচের তিন সহপাঠী বন্ধু। দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে বসে চা, গল্প, স্মৃতিচারণ ও প্রাণখোলা খুনসুটিতে তাঁরা ফিরে যান ফেলে আসা সেই সোনালি সময়ে।
আড্ডায় মিলিত হন মতলব উত্তর উপজেলাধীন ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ১৯৯৫ সালের শিক্ষার্থী অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন এবং একই উপজেলার মন্দাতলী মুজাদ্দেদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ’৯৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (আরআইসি) কুমিল্লার এরিয়া ম্যানেজার মো. নূরে আলম (৬২৩১)। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আরআইসি কুমিল্লা ময়নামতি শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মো. রবিউল ইসলাম (৮১০৫)।
দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় শুরুতেই তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। কর্মজীবনের ব্যস্ততা ও জীবনের নানা দায়িত্ব তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন পথে নিয়ে গেলেও মুখোমুখি হতেই ফিরে আসে পুরোনো সেই আন্তরিকতা। সময়ের সঙ্গে চেহারায় পরিবর্তন এসেছে, বেড়েছে জীবনের অভিজ্ঞতা, বদলেছে পেশাগত পরিচয়; কিন্তু সহপাঠী বন্ধুত্বের জায়গাটি রয়ে গেছে আগের মতোই নির্মল ও প্রাণবন্ত।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুরু হয় স্কুলজীবনের নানা গল্প। একে একে খুলে যায় স্মৃতির ঝাঁপি। পুরোনো সহপাঠী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শ্রেণিকক্ষের নানা ঘটনা, কৈশোরের দুষ্টুমি ও হাসি-ঠাট্টার স্মৃতি নিয়ে চলে প্রাণবন্ত আলোচনা।
কোনো পুরোনো ঘটনা মনে পড়তেই একজন হাসিতে ফেটে পড়েন, সঙ্গে যোগ দেন অন্যরাও। কখনো একে অপরকে পুরোনো কোনো ঘটনা মনে করিয়ে খোঁচা দেওয়া, আবার কখনো কৈশোরের মজার স্মৃতি তুলে ধরে হাসাহাসি—সব মিলিয়ে আড্ডাটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। বন্ধুত্বের সেই চিরচেনা খুনসুটিতে যেন বয়সের ব্যবধানও হারিয়ে যায়।
আড্ডার সঙ্গে ছিল রসনাবিলাসের আয়োজনও। খাবারের তালিকায় ছিল মাটন বটি কাবাব, নান রুটি, চাসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার। তবে খাবারের স্বাদকে ছাপিয়ে সেদিনের মূল আকর্ষণ ছিল বন্ধুত্বের উষ্ণতা। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে চলেছে গল্প, স্মৃতিচারণ, হাসি-ঠাট্টা ও নানা বিষয়ে প্রাণখোলা আলোচনা।
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিন সহপাঠী এখন নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। একজন আইন পেশায়, একজন শিক্ষা প্রশাসনে এবং অন্যজন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা তাঁদের ভিন্ন পথে নিয়ে গেলেও বন্ধুত্বের জায়গায় সম্পর্ক আজও অটুট।
বহু বছর পর দেখা হলেও তাঁদের কথাবার্তায় ছিল না কোনো অস্বস্তি কিংবা দূরত্ব। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা ফিরে যান পুরোনো দিনের সেই সহজ-সরল সম্পর্কের ভুবনে। মনে হয়েছে, মাঝখানের দীর্ঘ সময়টুকু যেন ছিলই না।
এই মিলন তাই শুধু একটি সাধারণ চা আড্ডা ছিল না; বরং ফেলে আসা কৈশোরকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখার এক আবেগঘন উপলক্ষ। ব্যস্ত জীবনের নানা দায়িত্ব ও সময়ের দূরত্বের মাঝে এমন একটি সন্ধ্যা তাঁদের মনে এনে দিয়েছে নতুন আনন্দ, প্রশান্তি ও পুরোনো বন্ধুত্বের উষ্ণতা।
চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠেছে, টেবিলে সাজানো ছিল মুখরোচক খাবার, চারপাশে ছিল হাসি-আনন্দ। আর কথার ফাঁকে ফাঁকে ফিরে এসেছে কয়েক দশক আগের অসংখ্য স্মৃতি। যে দিনগুলো হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু স্মৃতির পাতায় সেগুলো আজীবন অমলিন হয়ে থাকবে।
বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই—বছরের পর বছর দেখা না হলেও সত্যিকারের বন্ধুত্বের জায়গায় দূরত্ব তৈরি হয় না। একদিন দেখা হলেই মনে হয়, মাঝখানের এতগুলো বছর যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে।
কুমিল্লার সেই সন্ধ্যার আড্ডায় তাই শুধু তিনজন সহপাঠী বসেননি; তাঁদের সঙ্গে যেন ফিরে এসেছিল স্কুলজীবনের অসংখ্য স্মৃতি, হাসি-আনন্দ ও কয়েক দশকের পুরোনো বন্ধুত্ব। দীর্ঘদিন পরের এই মিলন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্বকে কখনো মুছে দিতে পারে না।
এসএসসি ’৯৫ ব্যাচের এই তিন সহপাঠীর চা আড্ডা তাই হয়ে থাকল চিরন্তন বন্ধুত্বের এক আবেগময়, স্মরণীয় ও সুন্দর উদাহরণ।