তাপস চন্দ্র সরকার।।
কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি, নাগরিক জীবনের নানা ব্যস্ততা আর প্রতিদিনের ছুটে চলার ভিড়ে মানুষ কখনো কখনো একটু থামতে চায়। ফিরে যেতে চায় প্রকৃতির কাছে, আপন মানুষের কাছে, নির্মল আনন্দের কাছে। আর সেই থেমে যাওয়ার মুহূর্তগুলোই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকে। তেমনই এক আনন্দময়, আবেগঘন ও স্মরণীয় দিন কাটালেন কুমিল্লা সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
ইলিশের রাজধানী খ্যাত চাঁদপুরের নদীর বুক, তিন নদীর মোহনার অপরূপ সৌন্দর্য এবং মতলব উত্তর উপজেলার মনোরম মোহনপুর পিকনিক স্পটকে ঘিরে শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, দিনব্যাপী এই আনন্দভ্রমণ পরিণত হয় হাসি, গান, আড্ডা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার এক অপূর্ব মিলনমেলায়। এ যেন ছিল ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দূরে গিয়ে হৃদয়টাকে একটু হালকা করে নেওয়া। ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতা, ছিল না ব্যস্ততার চাপ—ছিল শুধু আপনজনদের সঙ্গে প্রাণখোলা হাসি, গান, গল্প আর একসঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত বেঁচে নেওয়ার আয়োজন।
শুক্রবার সকাল ৮টা। কুমিল্লা নগরীর ঐতিহ্যবাহী টাউনহল মাঠ। একে একে সেখানে জড়ো হতে থাকেন সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে উচ্ছ্বাস, আবার কারও কণ্ঠে ছিল—আজকের দিনটা অন্যরকম হবে। নির্ধারিত সময়ে মাইক্রোবাসযোগে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত আনন্দভ্রমণের যাত্রা। দাউদকান্দি হয়ে গাড়ি যখন এগিয়ে চলছিল, তখন পথের সৌন্দর্যের পাশাপাশি চলছিল গল্প, হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতিচারণ আর প্রাণখোলা আড্ডা। সহযাত্রীদের সঙ্গে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে কখন যে চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেল, তা যেন কারও টেরই হলো না। অবশেষে দুপুর ১২টার দিকে সবাই পৌঁছে যান মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর পিকনিক স্পটে। মোহনপুরের সবুজ-শ্যামল পরিবেশ, নদীর স্নিগ্ধ বাতাস আর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুহূর্তেই মন কেড়ে নেয় সবার। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, গল্প আর আড্ডায় কেটে যায় সুন্দর কিছু সময়।
মোহনপুরে কিছুটা সময় কাটানোর পর শুরু হয় আনন্দভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়। এমভি সমতা সমৃদ্ধি-১ লঞ্চে চড়ে সবাই রওনা দেন চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনার উদ্দেশ্যে। লঞ্চ ধীরে ধীরে নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। চারপাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, নদীর বাতাস আর ঢেউয়ের মৃদু ছন্দ। সেই মুহূর্তে যেন প্রকৃতিই হয়ে উঠেছিল এক বিশাল মঞ্চ। এরই মধ্যে শুরু হয় দেশীয় লোকগানের আসর।
সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান পরিবেশন করে লঞ্চের পরিবেশকে করে তোলেন প্রাণবন্ত। তাঁর কণ্ঠে বাংলার মাটির গান, নদীর গান, মানুষের গান যেন নদীর জলরাশির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ঢোল ও একতারার সুরে গানের আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন মঞ্চের সদস্য অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। আর হারমোনিয়ামের মায়াবী সুরে গানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন কীবোর্ড বাদক ভূষণ সূত্রধর। অন্য সদস্যরাও করতাল ও ঝুরি বাজিয়ে গানের সঙ্গে তাল মেলান। মুহূর্তেই লঞ্চের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের ঢেউ। কারও মুখে গান, কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র, কেউ করতালিতে তাল দিচ্ছেন, কেউবা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছেন। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ভাটিয়ালি সুরের এই মেলবন্ধন যেন সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বাংলার চিরচেনা লোকজ সংস্কৃতির গভীরে। সেদিন নদীর বুক শুধু জল বহন করেনি—বয়ে নিয়ে গেছে মানুষের হাসি, ভালোবাসা আর আনন্দের সুর।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে লঞ্চ পৌঁছে যায় চাঁদপুর লঞ্চঘাটে। নদীভ্রমণের আনন্দের পর এবার ছিল চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী স্বাদ উপভোগের পালা। সবাই মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন ‘ক্যাফে মোহনা’ রেস্টুরেন্টে। খাবারের তালিকায় ছিল তাজা ইলিশ মাছ ভাজা, তাল-বেগুন ভাজা, আলু ভর্তাসহ আরও নানা মুখরোচক খাবার। ইলিশের রাজধানী চাঁদপুরে এসে ইলিশের স্বাদ—এ যেন আনন্দভ্রমণের পূর্ণতা। একসঙ্গে বসে খাবার গ্রহণ, পরস্পরের সঙ্গে হাসি-আড্ডা আর নানা স্মৃতিচারণে মধ্যাহ্নভোজও হয়ে ওঠে আনন্দের বিশেষ একটি মুহূর্ত। খাবারের স্বাদ যেমন তৃপ্ত করেছে রসনাকে, তেমনি আপন মানুষগুলোর সঙ্গে একই টেবিলে বসার আনন্দ তৃপ্ত করেছে মনকে।
মধ্যাহ্নভোজ শেষে সবাই চলে যান চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোহনায়। বিস্তীর্ণ নদীর জলরাশি, দূরের নৌযান, বাতাসের মৃদু দোলা আর নদীর অনন্ত সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে। কেউ দাঁড়িয়ে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন, কেউ ছবি তুলেছেন, কেউ ডাবের পানিতে তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। আবার কেউ আখের রসের স্বাদ নিয়ে ফিরে গেছেন শৈশবের সরল আনন্দে। এরই মধ্যে আবারও জমে ওঠে গান-বাজনার আসর। দিনের আলো ক্রমেই পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে, অথচ আনন্দের কোনো কমতি নেই। গান, হাসি, আড্ডা আর স্মৃতির গল্পে বিকেলটি যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে আসে। আনন্দঘন এসব মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেন সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্য ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন চন্দ্র দেবনাথ এবং মোঃ সাইফুল ইসলাম। পরবর্তীতে তারা ভ্রমণের বিভিন্ন মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, ফলে অংশগ্রহণকারীদের আনন্দের স্মৃতিগুলো আরও অনেকের কাছে পৌঁছে যায়।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা। এবার কুমিল্লার উদ্দেশ্যে ফেরার পালা। চাঁদপুরের নদী, মোহনা, গান আর ইলিশের স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে শুরু হয় ফিরতি যাত্রা। কিন্তু দিন শেষের পথে হলেও আনন্দের যেন কোনো শেষ নেই। পথিমধ্যে বাকিলা এলাকায় থামা হয়। সেখানে গরম গরম মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করেন সবাই। দিনের শেষ প্রান্তেও হাসি-আড্ডা আর আনন্দের রেশ ছিল অটুট।
অবশেষে রাত ৮টার দিকে কুমিল্লা টাউনহল মাঠে এসে পৌঁছান সবাই। সেখান থেকে যার যার মতো নিজ নিজ বাসার উদ্দেশ্যে ফিরে যান। গাড়ি থেকে নামার সময় হয়তো সবাই নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেছেন, কিন্তু মনটা যেন তখনও পড়ে ছিল চাঁদপুরের নদীর বুকে—যেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য সবাই ভুলে গিয়েছিলেন জীবনের সব ব্যস্ততা।
একটি আনন্দভ্রমণ কখনো শুধু একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়। একটি সুন্দর ভ্রমণ মানুষের মধ্যে তৈরি করে নতুন সম্পর্ক, পুরোনো সম্পর্ককে করে আরও গভীর, আর ব্যস্ত জীবনের ক্লান্ত মনে এনে দেয় প্রশান্তির পরশ। সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের এই আনন্দভ্রমণও ছিল ঠিক তেমনই। চাঁদপুরের নদীর ঢেউ, ভাটিয়ালি গানের সুর, ইলিশের স্বাদ, বড় স্টেশন মোহনার সৌন্দর্য, প্রাণখোলা হাসি, গল্প আর আড্ডা—সবকিছু মিলে ২১ আগস্টের দিনটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য স্মৃতির দিন। সেদিন কেউ ছিলেন না আলাদা। বয়সের ব্যবধান ছিল না, পেশাগত পরিচয়ের দূরত্ব ছিল না, ছিল না কে বড় আর কে ছোট—সবাই ছিলেন আনন্দের একই সারির মানুষ। সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য। এই একসঙ্গে পথচলা, একসঙ্গে গান গাওয়া, একসঙ্গে খাবার খাওয়া আর একসঙ্গে হাসার মুহূর্তগুলোই হয়তো আগামী দিনের ব্যস্ততায় সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।
এই স্মরণীয় আনন্দভ্রমণে অংশ নেন অধ্যক্ষ তপন সাহা, প্রফেসর নিখিল রায়, প্রফেসর অনুকূল চন্দ্র দাশ, প্রফেসর মৃনাল কান্তি গোস্বামী, সাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার প্রসাদ কুমার ভাওয়াল, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক অমৃত লাল দত্ত, মোঃ মোতালেব খান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেপাল চন্দ্র দাশ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গৌতম দাশ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কার্তিক করসহ সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের অন্যান্য সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
দিন শেষে হয়তো সবাই নিজ নিজ ঘরে ফিরেছেন। থেমে গেছে গান, শেষ হয়েছে আড্ডা, থেমে গেছে লঞ্চের যাত্রা। কিন্তু থামেনি স্মৃতির পথচলা। চাঁদপুরের নদীর ঢেউ যেমন একের পর এক তীরে এসে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে যায়, তেমনি সেদিনের স্মৃতিগুলোও বারবার ফিরে আসবে সবার মনে। কোনো এক ব্যস্ত বিকেলে হয়তো মনে পড়বে—একদিন সবাই মিলে নদীর বুকে গান গেয়েছিলাম। কোনো এক দুপুরে মনে পড়বে চাঁদপুরের ইলিশের স্বাদ। আবার কোনো এক সন্ধ্যায় মনে পড়বে বড় স্টেশন মোহনায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা সেই মুহূর্তগুলো।
তাই ২১ আগস্ট ২০২৬ শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে এটি হয়ে থাকবে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও নির্মল আনন্দে ভরা একটি স্মরণীয় দিন। সত্যিই, দিনটি শেষ হয়েছে—কিন্তু দিনের আনন্দ শেষ হয়নি। কারণ কিছু মুহূর্ত সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং স্মৃতির পাতায় আরও উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে থাকে।
সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের এমন সুন্দর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সকল সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী, আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। চাঁদপুরের নদীর বুকে যে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল, সেই ঢেউ ছড়িয়ে থাকুক সুপ্রভাত মঞ্চের প্রতিটি হৃদয়ে—বারবার, অনন্তকাল।