এবারের পূজা উৎসব সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে সাড়ম্বরে ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে, যা মূলত আমাদের সমতার বাংলাদেশের এক অনন্য রূপ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই স্বাধীন বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ সমান সুযোগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বসবাস করবে, এটিই প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রত্যাশা। তবে ধর্ম ও জাতকে কেন্দ্র করে এ দেশে রাজনীতি করা একটি অন্যতম নেতিবাচক দিক। ১৯৪৭ সালের দ্বি-জাতি তত্ত্বের মধ্য দিয়ে এই রাজনীতির প্রকাশ দৃশ্যমান হলেও, যুগ যুগ ধরে ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এই উপমহাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। উগ্রপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। এর ফলে কখনো মুসলমান, কখনো হিন্দু, আবার কখনো অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বৈষম্যের শিকার হন। এর একটি প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক মেলবন্ধনের ওপর।
এই বৈষম্য ও বিভেদের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মুসলমানদের ঈদ উৎসব যেমন অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে, ঠিক তেমনি এবারের পূজা উৎসবেও ব্যাপক জাঁকজমক ও উদ্দীপনা দেখা গেছে। বর্তমান সরকার একটি বৈষম্যহীন ও সমতার বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে অনেকটা এগিয়ে যেতে পেরেছে, এ চিত্র তারই প্রমাণ বহন করে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা সম্পূর্ণভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে দেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। রাজনীতি যখন ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে নীতি ও জনকল্যাণমুখী হয়, তখনই রাষ্ট্র প্রকৃত প্রগতির পথে এগিয়ে যায়। মূলত সকল ধর্মই সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে। দেশের মানুষ যদি কেবলমাত্র এই সত্য ও ন্যায়কে মনে-প্রাণে ধারণ করে রাজনীতি তথা জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে, তবেই সেই দেশ আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকরা চান এ দেশের রাজনীতি হবে সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতিভিত্তিক, কোনোভাবেই ধর্মভিত্তিক নয়। আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে এমন এক উন্মুক্ত চারণভূমি, যেখানে সকল জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই স্ব স্ব ধর্মীয় উৎসব স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদযাপন করতে পারবে। একই সাথে, রাষ্ট্র ও সমাজের চালিকাশক্তি তথা রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিটি নাগরিক স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য কাজ করার সমান সুযোগ পাবেন। এই ভূখণ্ডে ধর্ম বা জাত কখনো কারও মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠি হবে না, বরং দেশটা হবে সবার এবং এটিই হবে প্রকৃত সমতার বাংলাদেশ।
লেখক
মো রিয়াজুল ইসলাম
প্রভাষক ও কলামিস্ট