মো:সৈকত জামান প্রিন্স,ফুলছড়ি-গাইবান্ধা:
বিগত ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটেছিল ঢাকা জেলার সাভা উপজেলাস্থ রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ এ ট্রাজেডির ১০ বছর পূর্ণ হল। ওই দুর্ঘটনায় হতাহত গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরিবারের ৩০ জন সন্তানের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছে গাইবান্ধার ফুলছড়ির উপজেলার হোসেনপুরস্থ ‘অরকা হোম নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১৪ জন ছেলে এবং ১৬ জন মেয়ে। সেখানে লেখাপড়া, খেলাধুলা, বিনোদন ও মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠছে এসব শিশুরা।
অরকা-হোমস কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন (ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট এসোসিয়েশন) এর সদস্যরা ২০১৪ সালে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে “অরকা হোম” নামের এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলাবিশিষ্ট দুটি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলাবিশিষ্ট অপর একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এখানে উন্নত পরিবেশে ৩০ জন শিশু বসবাস করছে। তাদের জন্য মানসম্মত আবাসিক ব্যবস্থাসহ প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠগ্রহণ, বিনোদন, ক্রীড়া ও পাঠাগার রয়েছে। এই ৩০ জনের বাইরেও আরও ২৭ জন এতিম ছেলেমেয়ে এখানে বাস করে।
সূত্রটি আরও জানায়, অরকা হোমের মাঠেই রয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোসেনপুর মুসলিম একাডেমি। এখানেই ওইসব সন্তানরা লেখাপড়া করে আসছে। হোসেনপুর মুসলিম একাডেমিতে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছে। এই একাডেমিতে বর্তমানে প্রায় ৪০০ জন ছাত্র ছাত্রী ও ২০ জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় পার্শ্ববর্তী সূর্য্যমূখী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে।
রানা প্লাজায় আহত শ্রীমতি গীতারাণীর ছেলে শংকর কুমার রায়। তার পিতা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা গ্রামের স্বপন চন্দ্র রায়। শংকর কুমার রায় বলেন, আমার মা রানা প্লাজার ৪র্থ তলার পোষাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বাড়িতে ফিরে আসে মা। সরকারিভাবে ৩ লাখ টাকা সাহায্য পেয়েছিল। যা দিয়ে কোনমতে সংসার চলছে। আমি এখন অরকা হোমে থেকে লেখাপড়া করছি। আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে প্রকৌশলী হতে চাই।
নিহত নার্গিস বেগমের ছেলে আল-আমিন মিয়া। পিতা গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কিশামত শেরপুর গ্রামের তোজাম্মেল হক তুহিন। আল-আমিন জানায়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় মা মারা যাবার পর এখানেই আমার ঠাঁই হয়েছে। আমি অরকা হোম এর সহায়তা লেখাপড়া করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
হোসনেপুর মুসলিম একাডেমি ও অরকা হোমের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত রফিক মিয়া বলেন, রানা প্লাজার ট্রাজেডির হতাহত পরিবারের যেসকল সন্তান এখানে রয়েছে তাদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ অরকা হোম থেকে বহন করা হচ্ছে। সেই সাথে বিজিএমইএ নামের সংগঠনটি প্রতি মাসে কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা করে আসছে। গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার হতাহতের ছেলে মেয়েরা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। এদের কারো বাবা, আবার কারো মা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। এসব হতাহত পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।
মেয়েদের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত নুরজাহান বেগম বলেন, মেয়েদের পৃথক ভবনে রেখে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়ে থাকে। এখানে বসবাসকারী মেয়ে শিশুদের লেখাপড়া শেষে কর্মসংস্থান ও বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, দুজন চিকিত্সক সপ্তাহে দুই দিন এখানে এসে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন।
হোসনেপুর মুসলিম একাডেমি ও অরকা হোমের প্রধান উদ্যোক্তা ওই গ্রামের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ক্যাপটেন) জাহান ইয়ার মুঠোফোনে বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়বে।